সমবায় আইনে বঙ্গবন্ধুর সমবায় দর্শনকে গুরুত্ব দিতে হবে
গত ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ সকাল সাড়ে ১০ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম “প্রচলিত সমবায় আইন সংস্কার এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকার” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা সমবায় আইনে বঙ্গবন্ধুর সমবায় দর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে তার সংস্কার ও বাস্তবায়নের দাবি জানান।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রওশন আরা’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মাননীয় সাংসদ রাশেদ খান মেনন সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, গ্রীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন এবং এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এতে সমবায় আইনের একটি পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন নর্থ-সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. রিজওয়ানুল ইসলাম। এতে তিনি বর্তমান সমবায় আইনের সংস্কারের জন্য ১৩টি সুপারিশ তুলে ধরেন।
সেমিনারে সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেন, শুধু আইন সংস্কারের কথা বললে হবে না। এটাকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তাছাড়া আইন সংস্কারের এটা উপযুক্ত সময়। কারণ আগামী বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’র জন্ম শতবার্ষিকী পালন করা হবে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সমবায় দর্শনকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছেন। তিনি আরো বলেন, এখনকার সমবায়গুলো ব্যবসা কেন্দ্রিক হয়েছে কিন্ত তা সমবায়ের দর্শণকে লালন করছে না। উদাহরণস্বরূপ তিনি কুমিল্লা বার্ড (ইঅজউ)-এর মডেলকে অনুসরণ করার কথা বলেন। এছাড়াও তিনি কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সমবায়কে মূল ভূমিকায় থাকার বিষয়ে জোর দেন। এজন্য তিনি এএলআরডিকে সমবায় গড়ে তোলাসহ এ আন্দোলনকে বেগবান করতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সমবায় আইনটি বর্তমানে কর্তৃত্বমূলক হয়ে গেছে, যার সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণের আর্থিক উন্নয়নের পথ সমবায়। তাই সমবায়কে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে। বর্তমানে এটাকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না এবং এআইনের অপব্যবহার হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশে সমবায়কে সহযোগিতা করার জন্য মনিটরিং কার হয় কিন্ত এই রেওয়াজ আমাদের দেশে নেই বলেই চলে। আছে শুধু কর্তৃত্ব। যেটুকু সমবায় গড়ে ওঠে তাতে সরকার ও প্রভাবশালীরা মালিকানায় ভাগ বসায়। ফলে দেখা যায় মৎস্যজীবী সমবায়ে অমৎস্যজীবীর দৌরাত্ম। একারণে পিছিয়ে পড়া মানুষের সমবায় গড়ে তোলার সুযোগ থাকে না।
শামসুল হুদা বলেন, বর্তমান সমবায় আইনটি সমবায় গঠনের অন্তরায়। সাধারণ মানুষের সমবায়কে এই আইন স্বীকৃতি দেয়না। কারণ সমবায়ের কথা বলতে গেলে অবশ্যই সমবায় অধিপ্তরের নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংবিধানের ১৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পদের মালিকানায় সমবায় মালিকানাকে ২য় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়াও এই আইনে বঙ্গবন্ধুর সমবায় দর্শনের কোন প্রতিফলন নেই। তাই মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য এই আইন সংস্কার করা জরুরি।
এছাড়া এতে ড. আবুল হোসেন বলেন, সমবায়ের আলোচনা শুধু আইনের ভাষা দিয়ে হবেনা। সমবায়ের বিবর্তনের বিষয়টিকে লক্ষ্য হিসেবে রাখতে হবে।
সেমিনারের সভাপতি ড. রওশন আরা বলেন, সমবায় আইনের সংস্থারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পল্লী ঋণের জন্য সমবায়কে গুরুত্ব দেয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রকৃত প্রকৃত কৃষক, ভূমিহীন, তাঁতি, মৎস্যজীবীরা সমবায়ের নিবন্ধন ও সুবিধা পায় না। তিনি আরো বলেন, সমবায়ের উদ্দেশ্য সুষম বন্টন। তাই সম্পদের সুষম বন্টন ও মানুষের আয় বৈষম্য কমাতে সমবায় অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সমবায়ের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব। এছাড়া মুক্ত আলোচনায় তৃণমূলের জনসবায়ের নারী প্রতিনিধিসহ যুব ও বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা এতে তৃণমূলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমবায়ের বাস্তব ও তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ আইন সংস্কারের জোর দাবী জানান। সেমিনারে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশে উল্লেখযোগ্য হলো-কোন সমবায় সমিতিকে নিবন্ধন দেয়া না হলে সে ব্যাপারে দেওয়ানী আদালতে চ্যালেঞ্জের সুযোগ; কোন অযোগ্য সমিতিকে নিবন্ধন দেয়া হলে তাকেও চ্যালেঞ্জের সুযোগ; সমবায়ীদের অধিকতর স্ব-শাসন সুনিশ্চিত করা এবং সমবায় সমিতিতে সরকার মনোনীত সদস্য না রাখার বিধান; সমিতির সদস্যদের দ্বারা মনোনীত কোন ম্যানেজিং কমিটির সদস্যকে তাঁর পদ থেকে বহিষ্কারের আগে সমবায়ীদের অনুমোদন নেয়ার বিধান; সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সমিতি বন্ধ করে দেবার বিধান বাতিল করে বিষয়টি দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে ফয়সালার বিধান; কেউ অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হলে ফৌজদারী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে, সমবায় অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণের বিধান বিলোপ করা; সমবায় সমিতিগুলির সক্ষমতাবৃদ্ধি, তাদের নিয়মিত চাহিদা নিরূপন এবং সমবায় পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র স্বাধীন সংস্থা রাখার বিধান আইনে রাখার দাবি জানানো হয়।